মর্গে রাখা মৃত নারীদের ধর্ষণের অভিযোগে মুন্না গ্রেফতার

মর্গে রাখা মৃত নারীদের ধর্ষণের অভিযোগে মুন্না গ্রেফতার

0
20
fb-share-icon20

 

প্রতিবেদক, প্রেসবাংলা: কোন না কোনভাবে রাজধানীর একটি হাসপাতালের মর্গে রাখা মৃত নারীর সঙ্গে কোন ব্যক্তি বিকৃত যৌন লালসা চরিতার্থ করেছে; এমন তথ্যের ভিত্তিতে নড়ে ওঠে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

 

পরে তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে মর্গে রাখা মৃত নারীদের ধর্ষণের অভিযোগে মুন্না ভগত (২০) নামে এক যুবককে বৃহস্পতিবার রাতে গ্রেফতার করা হয়।

সিআইডির তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছে, ডোম রজত কুমার লালের ভাগিনা মুন্না ভগত। তিনি মামার সঙ্গেই ওই হাসপাতাল মর্গে সহযোগি হিসেবে কাজ করত। দুই-তিন বছর ধরে মুন্না মর্গে থাকা মৃত নারীদের ধর্ষণ করে আসছিল।

 

তদন্তের শুরুতে মুন্নাকে সিরিয়াল কিলার সন্দেহও করেছিল সংশ্লিষ্টরা
সিআইডির তদন্ত প্রক্রিয়ায় উঠে আসে, প্রত্যেকটি মৃতদেহেরই ময়নাতদন্ত ওই হাসপাতালের মর্গে করা হয়েছে। সিআইডি গোয়েন্দাদের অনুসন্ধানে নতুন ইঙ্গিত বা ক্লু পাওয়ায় প্রত্যেকটি মৃতদেহ মর্গে আনার পর তার কার্যধারা বিশ্লেষণ করা হয়।

 

এতে দেখা যায় ময়নাতদন্তের জন্য আনা লাশগুলো পরের দিনে লাশ কাটার অপেক্ষায় মর্গে রেখে দেয়া হতো। এ প্রেক্ষিতে সিআইডি কর্মকর্তারা মর্গে কর্মরত ডোমদের ওই মামলার ময়না তদন্তকালীন গতিবিধি পর্যালোচনা করে দেখেন যে, হাসপাতালের ডোম আলোচ্য পাঁচটি ঘটনার সময় রাতে লাশ পাহাড়া দেয়াসহ মর্গে ছিল।

 

বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্য ও গোপনে তথ্য সংগ্রহ করলে সিআইডির অনুসন্ধানে ডোম আসামী মুন্না ভগত এই অপরাধে জড়িত আছে মর্মে প্রমাণ পায়।

 

বিষয়টি টের পেয়ে তাৎক্ষনিত গা ঢাকা দিলে সিআইডির সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয় এবং এরই প্রেক্ষিতে শেরেবাংলা নগর থানায় একটি মামলা দায়ের করে সিআইডি (নং- ৪০)।

 

আসামির ডিএনএ আলামত সংগ্রহ করে ল্যাবে পাঠানোর পর ডিএনএ ল্যাব থেকে আসামি মুন্নার প্রাপ্ত ডিএনএ প্রোফাইলের সঙ্গে  মৃতদেহের ডিএনএ প্রোফাইলের সাথে মিলে যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, পাঁচটি মরদেহে একই ব্যক্তির শুক্রাণুর উপস্থিতি মিলে যাওয়ার পর ঘটনার ভয়াবহতায় তদন্তের শুরুতে আমরা সিরিয়াল কিলার কিংবা সিরিয়াল রেপিস্টদের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে ধরে তদন্ত শুরু করেছিলাম।

তবে সুরতহাল কিংবা ময়না তদন্তের প্রতিবেদনে মরদেহে আঘাতের চিহ্ন না পাওয়ায় তদন্তে মোড় আসে। এরপরই মর্গেই মৃত নারীদের ধর্ষণ করা হতে পারে সন্দেহে তদন্ত শুরু সিআইডির তদন্ত টিম।

মুন্নাকে ধরতে তদন্ত কর্মকর্তাদের নাটক
ডোম রজত কুমার লালের ভাগিনা মুন্না ভগতকে সন্দেহে মাঠে নামে সিআইডির তদন্ত টিম। গুমের শিকার হওয়া এক যুবকের স্বজন সেজে মুন্নার সাথে সখ্যতা গড়ে তোলেন সিআইডির দুই কর্মকর্তা। শুরু হয় নাটকীয়তা। বেশ কয়েকদিন লাগাতার তারা মুন্নাকে ফলো করতে থাকেন। রাতে মুন্নাই থাকে এটি নিশ্চিত হতে তারা রাত ১টা বা ২টায়ও মর্গে গিয়েছেন। ছবি দেখিয়ে জানতে চেয়েছেন এই চেহারার কোনো লাশ মর্গে এসেছে কিনা। সম্পর্ক গাঢ় হলে, কৌশলে মুন্নার পান করা সিগারেটের ফিল্টার সংগ্রহ করেন তারা। ফিল্টার থেকে সংগ্রহ করা ডিএনএ’র সাথে মিলে যায় ওই পাঁচ কিশোরীর দেহে পাওয়া ডিএনএ।

 

মরদেহে পাওয়া শুক্রাণুর ওপর ভিত্তি করে আসামির ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি
সিআইডির বিবৃতিতে জানানো হয়, বাংলাদেশে ধর্ষণ, হত্যাসহ যেসব ঘটনায় মরদেহ ময়নাতদন্ত করার নির্দেশ দেয়া হয়, সেসব আলামতের ডিএনএ পরীক্ষা এবং প্রোফাইল তৈরি করে থাকে সিআইডি।

 

২০১৯’এর মার্চ থেকে ২০২০’এর অগাস্ট পর্যন্ত একটি মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ থেকে পাওয়া মৃত নারীদের দেহে পুরুষ শুক্রাণুর উপস্থিতি পায় সিআইডি। কিন্তু একাধিক নারীর মরদেহে একজন পুরুষের শুক্রাণুর উপস্থিতি তাদের চমকে দেয়। তারা সেই পুরুষকে চিহ্নিত করার জন্য মাঠে নামে।

 

বিবৃতিতে সিআইডি বলেছে, মরদেহে পাওয়া শুক্রাণুর ওপর ভিত্তি করে সেই পুরুষের ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করা হয়।

 

পরে ঢাকার মোহাম্মদপুর ও কাফরুল থানার কয়েকটি ঘটনা থেকে পাওয়া ডিএনএ প্রোফাইলের সাথে সন্দেহভাজন ব্যক্তির ডিএনএ প্রোফাইল মিলে যায় ।

 

প্রাথমিকভাবে সিআইডি’র ধারণা ছিল, প্রতিটি ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি ভুক্তভোগীকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছে অথবা হত্যার পর ধর্ষণ করেছে।

 

তবে পরে আরও বিস্তারিত অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণের পর সিআইডি সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে কোনো একজন ব্যক্তি মরদেহের ওপর ‘বিকৃত যৌন লালসা চরিতার্থ’ করছে।

 

রাতে প্রেমিকার সঙ্গে ফোনালাপের পর ধর্ষণ
তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, মুন্নার সঙ্গে দু’বছর ধরে এক আত্মীয় তরুণীর প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে।রাতে প্রেমিকার সঙ্গে প্রেমালাপের পর সে আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারত না। তাই সে বিকৃত যৌন কাজে লিপ্ত হতো।

 

মৃতদেহের সঙ্গে সেলফিও তুলতো মুন্না
আসামি মুন্নার মোবাইল ঘেটে মানসিক বিকৃতির আর প্রমাণ পেয়েছে সিআইডি। এক কর্মকর্তা জানান, মুন্না মৃতদেহের সঙ্গে সেলফি তুলত। এক্ষেত্রে তার পছন্দের তালিকার শুরুতে ছিল তরুণীদের লাশ। এ ছাড়াও নানা বয়সের নারী মৃতদেহের কাটা ফাঁড়ার ভিডিও করত।

 

তরুণীদের মৃতদেহ মুন্নার কাছে ‘ভালো’ লাশ
বিকৃত মানসিকতার মুন্না সব মৃতদেহ সমান নজরে দেখতেন না বলে কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন। সিআইডির এক কর্মকর্তা জানান, মুন্নার কাছে কম বয়সী তরুণীদের মৃতদেহ হলো ‘ভালো’ লাশ। আর বয়স্ক নারী ও পুরুষদের লাশ হলো ‘খারাপ’ লাশ।

 

হাইকোর্টের ঐতিহাসিক নির্দেশনা
২০১৫ সালে হাইকোর্ট এক আদিবাসী নারীর অপমৃত্যু মামলার রায়ে এক ঐতিহাসিক নির্দেশ দেন। তাতে বলা হয়, কোনও নারীর অপমৃত্যু হলে, তাদের যৌনাঙ্গ থেকে শুক্রাণু সংগ্রহ করে সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করতে হবে। দেখতে হবে অপমৃত্যুর আগে কোনও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে কিনা। তারপর থেকে সিআইডির ফরেনসিক ল্যাব আদালতের নির্দেশ মেনে আসছে।

 

0
20
fb-share-icon20
0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
কপিরাইট © ২০২০ | প্রেসবাংলাটুয়েন্টিফোরডটকম
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x