‘শিক্ষকদের সাথে ভীষণ বিনয়ী ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’

ড. জেবউননেছা, প্রেসবাংলা২৪.কম:
কয়দিন ধরে ভাবছিলাম শিক্ষকতা নিয়ে কিছু লিখব। ভাবলাম আজ না হয় লিখেই ফেলি।শুরুতেই কয়েকটি স্মৃতিকথা লিখব।
স্মৃতি -১ বেশ কয়েকদিন পূর্বে আমার সম্পাদিত “মুক্তিযুদ্ধ ও বুদ্ধিজীবীর দৃষ্টিকোণ ” নামক গ্রন্থে লেখা সংগ্রহের জন্য জাতীয় অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান স্যারের সাথে সাক্ষাত করেছিলাম,স্যার কথার মাঝে একটি স্মৃতি মনে করলেন,
“স্যারের কাছে একদিন একজন ছাত্রী এসে বলছিলেন
ছাত্রীঃ স্যার কাল বাসায় একটা প্রোগ্রাম আছে,ক্লাশে অনুপস্থিত থাকতে হবে স্যার
স্যার ঃ আচ্ছা,তোমার বাসা কোথায়?
ছাত্রীঃ ধানমন্ডি
স্যারঃ ধানমণ্ডি কোথায়ঃ
ছাত্রী ঃ ৩২
স্যার ঃতুমি বঙ্গবন্ধুর মেয়ে এতক্ষন বললেনা কেন?
ছাত্রীঃ স্যার এমনি।
স্যার বলছিলেন,হাসিনাকে কখনও বসতে বললে, বসতনা,দাড়িয়েই থাকত, ভীষণ বিনয়ী ছিল,আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
সময় যখন একবিংশ শতক
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সরাসরি শিক্ষককে লাল গালিচা ছেড়ে দেন,গায়ের চাদর ঠিক করে দেন।মঞ্চ থেকে শিক্ষককে সালাম দেন এবং কোন কোন রাষ্ট্রীয় অনুষ্টানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দুপাশে আনিসুজ্জামান স্যার এবং রফিক স্যারকে আসন দিয়ে সম্মান করেন।
স্মৃতি -২ সেই ছোটবেলা আব্বু আম্মু শিখিয়েছিলেন, তোমার শিক্ষক আমাদের পর পরই তাদের স্থান। যে তোমাকে এক মিনিট শেখালেন,সে ও তোমার শিক্ষক।সেই যে শিখেছি, আজ অবধি শিক্ষকের দিকে তাকিয়ে কথা বলা দূরের কথা, শিক্ষক যা বলেন তাই মাথা পেতে নেই। সরাসরি শিক্ষক আমার বিভাগে আসলে আমি চেয়ারম্যানের চেয়ারে বসিনা,শিক্ষক আদেশ দিলেও বসিনা।বিনয়ের সাথে বলি,স্যার/ ম্যাম আমাকে ক্ষমা করবেন,এটা পারবনা।তারপর আর বসিনা।
স্মৃতি -৩ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুনর্মিলনী-২০১৯ এর স্মরণিকা “যাত্রিক” এর সম্পাদনা পরিষদের সদস্য হিসেবে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে সাহস করে আমি একটি লেখা দিলাম,”আমার শিক্ষক আমার মাথার তাজ” এই শিরোনামে। সম্পাদনা পরিষদের সদস্য হওয়া সত্তেও আমার লেখাটি প্রকাশ হবে কিনা,এ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলাম।কেননা,৫০ দশক থেকে অনেক জ্ঞানী গুণি ব্যক্তি যারা আছেন,তাদের লেখা প্রকাশ বেশি জরুরি ছিল।কারণ তাদের কাছে আমি নিতান্তই নগন্য।লেখা বাছাইয়ের শেষ দিন নিশ্চিত হলাম,আমার লেখাটি প্রকাশ হবে।একটি কারণে, লেখাটি শিক্ষকবৃন্দকে নিয়ে লেখা। যা আজকাল চোখে পড়ে কম।
স্মৃতি -৪ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগলাভের পর আমার শিক্ষাগুরু অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোহাব্বত খান স্যারের দোয়া নিতে যাওয়ার পর, স্যার দুটি কথা বলেছিলেন,
“সততার পথ বন্ধুর, একটি বন্ধু ও থাকবেনা,তাই বলে সৎ পথ ছাড়া যাবেনা”
“জীবনে একজন শিক্ষার্থীকে যদি প্রকৃত অর্থে মানুষ হিসেবে গড়তে পারো,সেটাই হবে শিক্ষকের সার্থকতা।
শিক্ষকতা করছি প্রায় সাড়ে তের বছর ধরে।শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি “নীতি ও নৈতিকতা ” নিয়ে কথা বলেছি। চেষ্টা করেছি মানুষ তৈরী করার।শ্রেণীকক্ষে সব সময় পিছনে যারা বসে,তাদের দিকে লক্ষ্য রাখি।
আজ সকালে ঘুম থেকে উঠার পর একটি প্রতিবেদন চোখে পড়ল। প্রতিবেদনে লক্ষ্য করলাম বিশ্বে ৩৬% মানুষ গুরুজনকে সম্মান করে,যেখানে চীনে ৮১% শিক্ষককে সম্মান করে।প্রতিবেদনটি পড়ে ভাবছিলাম,তাহলে কি ভুলই করলাম,সরকারি চাকরি ছেড়ে শিক্ষকতায় এসে।
মনটা সারাদিন বিষন্ন হয়েছিল,দুপুরে মুঠোফোনে অপরিচিত একটি নাম্বার বাজছিল,রিসিভ করলাম
আমি ঃ হ্যালো
অপরিচিত ঃ ম্যাম আমি জাবি লোকপ্রশাসন বিভাগের ৩য় ব্যাচের আসাদ
আমিঃ কি খবর আব্বা?
আসাদঃ ম্যাম আমি একটি চাকরি পেয়েছি,উপজেলা খাদ্য পরিদর্শক হিসেবে।
আমিঃ অভিনন্দন তোমাকে
আসাদঃ ম্যাম,এর আগে আমি ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার হিসেবে চাকরি পেয়েছিলাম, কিন্ত যাইনি
আমিঃ কেন যাওনি?
আসাদঃ ম্যাম আপনি সবসময় বলতেন,জীবনে যদি কিছু করার সুযোগ থাকে,তাহলে মানুষের জন্য করবে।
ম্যাম,সেই চিন্তা থেকে।ম্যাম এই চাকরিটায় মানুষের জন্য কিছু করার সুযোগ আছে।তাই এটাতে যাব।
আমিঃ তুমি এতদিন ধরে এই কথা মনে রেখেছ?
আসাদঃ জী ম্যাম।
আমিঃ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লাম(চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে, কথা কাঁপছিলো।তা ও সামলে নিয়ে বললাম,আমি তো ভেবেছিলাম,আমি বোধ হয় কাউকে মানবিক সম্পন্ন মানুষ বানাতে পারিনি।
আসাদঃ না ম্যাম,আপনার প্রতিটি কথা মনে আছে।
আমিঃ কোনভাবেই কান্না থামাতে পারছিনা,এই আনন্দে যে,অমানবিকতা আর শ্রদ্ধার দুর্দিনে আমার এই ছাত্রটি আমার একটি কথায় জীবন গড়ার শপথ গ্রহণ করেছে।একজন শিক্ষকের জীবনে এর চেয়ে বেশি চাওয়ার কি আর পাওয়ার কি আছে? খান স্যারের সেই কথা মনে পড়ে গেল,একজন ছাত্রকে কমপক্ষে পেরেছি,মানবিক বোধ সম্পন্ন জীবনের দিকে প্রেরণ করতে।
চারিদিকে বিবেকের দৈন্যতা,একতার দৈন্যতা।কয়দিন আগে আমার সাথে একজন গল্প করছিলো,
জানেন আমি “ম” শিক্ষককে নিয়ে বেশি গল্প করি,আর সামাজিক মাধ্যমে লিখি বলে, “ফ” শিক্ষক আমাকে গত দুই সেমেষ্টারে তার কোর্সে ফাসিয়ে দিয়েছে।
আর একজন “ই” শিক্ষার্থী সেই “ক্ষ” শিক্ষকের পক্ষে দাড়ালে, সেই “ফ” শিক্ষক সেই “ই” শিক্ষার্থীকে নানাভাবে বুঝানোর চেষ্টা করছে,দরকার কি “ক্ষ” শিক্ষকের পক্ষে দাড়ানোর?সমস্যা যেখানে আছে, সমাধান সেখানে আছে।
কয়দিন আগে লোক প্রশাসন বিভাগকে কলেজ এ নেবার বিষয়ে একযোগে মানববন্ধনের ব্যবস্থা করেছিলাম।”গ” বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী আমাকে ক্ষুদেবার্তা দিয়ে জানাল,আমরা সবাই মনে প্রাণে চাই,কিন্ত আমরা অসহায়,মুখ ফুটে কিছু বলতে পারিনা,আমরা শিক্ষকের নোংরা রাজনীতির শিকার
(প্রমাণ চাইলে দিতে পারব)।
আর একটি গল্প বলি,এক “ম” শিক্ষার্থী “হ” শিক্ষকের সাথে খুব খাতির। “হ” শিক্ষক ও তাকে বিশ্বাস করে অনেক কথা শেয়ার করেছেন । পরে জানা গেল সেই শিক্ষার্থী “ল” শিক্ষকের লোক। তার কাছে গিয়ে সব কথা সে বলে দেয়।
ইতিবাচক, নেতিবাচক দুটো বলার কারণ ঃ
১. শিক্ষকের কাজ আমলা নয়,মানুষ সৃষ্টি করা
২.যে যেখানে আছে তার জায়গায় কিভাবে বিকশিত
করা যায়, এই স্বপ্নের দ্বারা যে তাড়িত হবে সেই মানুষটি হলেন শিক্ষক।
৩. শিক্ষক শিক্ষার্থীদের ভাগ বিভক্তি শেখাবেননা, শেখাবেন সমতা
৪. শিক্ষক হয়ে শিক্ষার্থীদের অন্য শিক্ষকের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিবেননা।
৫. শ্রেণিকক্ষে দরজা বন্ধ করে বলবেননা, অমুক শিক্ষককে তালা মেরে দাও।
৬. শিক্ষক সকল শিক্ষার্থীবৃন্দকে সমান চোখে দেখবেন
৭. শিক্ষক কখনই তার শিক্ষার্থীদের লাঠিয়াল বানাবেনা।।
৮. শিক্ষক শ্রেণিককক্ষে গিয়ে বলবেননা, অমুক শিক্ষক কিছু জানেনা বলে স্লাইড দেখে  পড়ায়, আমি সবজান্তা তাই পাঠ্যবই থেকে পড়াই।
৯. শিক্ষক সবাইকে সমান চোখে দেখবেন।
১০. শিক্ষক হবেন, বটগাছের মতন।
এমতাবস্থায়, এই কাজগুলো যদি কোন শিক্ষক করেন, তাহলে সেই হবে একজন অনুকরণীয় শিক্ষক।
কিন্ত আদতে কি সম্ভব এর বাইরে যাওয়া?
একজন শিক্ষক যখন আর একজন শিক্ষকের বিপক্ষে দাড় করানোর চেষ্টা করেন,তার মনে রাখা উচিত।এই শিক্ষার্থী একদিন বড় হয়ে তাকে ঘৃনা করবে।বেচারা শিক্ষার্থী সিজিপিএ কমে যাওয়ার ভয়ে বা বাড়িয়ে যাবার লোভে সেই শিক্ষকের হাতের তালুতে পড়ে থাকে।
কেন বিশ্বব্যাপী আজ গুরুজনকে শ্রদ্ধার মান শতকরা ৩৬%।একবার ভেবে দেখেছি কেউ?
কয়দিন আগে যে কোন একটি বিষয়ে খুব বিরক্ত হয়ে আমার স্বামী মবিন উদ্দিন বলছিলেন,শিক্ষকের কাজ ক্লাশ নেয়া,গবেষণা করা,এত রাজনীতি থাকবে কেন? আমি তার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিনি।আজকে চীনে কেন ৮১% মানুষ শিক্ষককে সম্মান করবেনা?
সে দেশে নিশ্চই কোন শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ বা আগুনে পোড়ানোর ঘটনা ঘটেনা।শিক্ষার্থীদের রাজনীতির উপকরণ করা হয়না?
একজন ছাত্রের জীবনের রক্তের কণায় কণায় শিক্ষকের থাকা উচিত।আর সেজন্য শিক্ষককে হতে হবে আদর্শবান।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার পুত্রের শিক্ষককে চিঠিতে বলেছিলেন, “আমার ছেলেকে শেখাবেন,যারা পীড়ণকারী তাদেরকে সহজে কাবু করা যায়।যারা নির্দয় নির্মম তাদেরকে সে যেন ঘৃণা করতে শিখে।” কত গুরুদায়িত্ব একজন শিক্ষকের।অথচ তা কতটুকু শেখানো হয়।সেটা প্রত্যেকে নিজেকে প্রশ্ন করলেই উওর পাওয়া যাবে।
শুরুতেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষকের একটি স্মৃতিকথা দিয়ে শুরু করেছিলাম। এজন্য যে,আমি ও অপেক্ষা করি,প্রার্থনা করি,আমার শিক্ষার্থী একদিন আমার গায়ের চাদর ঠিক করে দিবে, লাল গালিচায় আমাকে হাটতে দিয়ে,সে গালিচা ছেড়ে দিবে। আমি সেদিন পাইন ট্রি হবো,আমার শিক্ষার্থী ওক ট্রি হবে।কারণ আমি ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষার্থীদের শেখানোর চেষ্টা করি,ভাল ফলাফলের চেয়ে ভাল মানুষ হওয়া জরুরি। না খেয়ে থাকবে,কিন্ত সৎ পথ ছাড়বেনা।বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি শ্রেণীকক্ষে গিয়ে কারো ব্যাপারে বিষোদগার করিনা।কোন শিক্ষার্থীকে তার প্রাপ্য নাম্বার থেকে ঠকাইনা। আর শিখানোর চেষ্টা করি,জ্ঞানী হও,জ্ঞানপাপী হইওনা। যেহেতু এগুলো শিখাইনা, সেহেতু সম্মান তো আশা করতেই পারি।
শিক্ষককে সম্মান করা শুধু একটি নৈতিক দায়িত্বই নয়। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ফলাফলের জন্য ও গুরুত্বপূর্ণ।
আল্লাহর রহমত,বাবা মা আর শিক্ষকদের দোয়ায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আজ এই মর্যাদায় আসীন।
ছেলেবেলায় কাজী কাদের নেওয়াজে”র “বাদশাহ আলমগীর ” কবিতাটি আজ খুব মনে পড়ছে,
“বাদশাহ কহেন,” সেদিন প্রভাতে আমি দাড়ায়ে তফাতে
নিজ হাতে যবে চরণ আপনি করেন প্রক্ষালন,
পুত্র আমার জল ঢালি শুধু ভিজাইছে চরণ।
নিজ হাতখানি আপনার পায়ে বুলাইয়া সযতনে
ধুয়ে দিল না’ক কেন সে চরণ স্মরি ব্যথা পাই মনে।
উচ্ছাস ভরে শিক্ষকে আজি দাঁড়ায়ে সগৌরবে
কুর্নিশ করি,বাদশাহ তারে কহেন উচ্চস্বরে।
“আজি হতে চির উন্নত হলো শিক্ষাগুরুর শির
সত্যই তুমি মহান উদার বাদশাহর আলমগীর”।
এই কবিতার প্রতি চরণ আমার জীবন চলার পাথেয় হয়ে আছে।
ছোটবেলায় শিখেছি ” ছাত্র” শব্দটি এসেছে “ছাতা’ থেকে আর ” ছাত্র” শব্দের অর্থ “যে গুরুর দোষ ঢেকে রাখে”।
হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর মাঝে যদি একজন ” ছাত্র” পাই যে আমার দোষ ঢেকে রাখবে।সেই হবে আমার “ছাত্র”।
শিক্ষার মান যতদিন থাকবে,এই সভ্যতা ততদিন থাকবে।শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা সম্মান শিক্ষার মানকে আরো বাড়াবে।
শেষ করব,আলোর পথযাত্রী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়িদ স্যারের একটি কথা দিয়ে, ছাত্রছাত্রীদের জন্য আমার একটি কথা, থামো, দৌড়াও কিন্ত থামতে শিখো, দাঁড়াতে শেখো, গাছ হতে শেখো। গাছের মত সমুন্নত, গাছের মতো পোশাক আবহ, গাছের মত পাতায় ভরা, ফুলে ভরা, সৌন্দর্যে ভরা, তাহলে কিছু সত্যিকারভাবে শিখতে পারবে। তা না হলে হাততালি এবং শিস দেয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকবেনা।”
ড. জেবউননেছা
সহযোগী অধ্যাপক
লোকপ্রশাসন বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published.

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com