এক বছরে সড়কে মৃত্যুর হার ৩০ শতাংশ বেড়েছে

গেল এক বছরে সড়ক পথে মৃত্যুর হার বেড়েছে ৩০ শতাংশ যা গত বছরের তুলনায় বেশি। এর মধ্যে গতকাল শুক্রবার ঢাকাসহ সারা দেশে অন্তত ১৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

সড়ক যোগাযোগের উন্নয়নে গত এক যুগে জাতীয় বাজেটে ধারাবাহিকভাবে বরাদ্দ বেড়েছে। এই সময়ে নতুন সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি পুরোনো সড়কও চওড়া হয়েছে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে সড়ক আইনও পাস করেছে সরকার। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সড়কে মৃত্যু বেড়েই চলেছে। করোনা মহামারির মধ্যেও সরকারি হিসাবেই গত এক বছরে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। পুলিশের হিসাবে ২০২০ সালের তুলনায় দেশে ২০২১ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু এক হাজারের বেশি বেড়েছে।

গতকাল শুক্রবারও ঢাকাসহ সারা দেশে অন্তত ১৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সকালে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইলে ইউটান নেওয়ার সময় বাসের ধাক্কায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার তিন যাত্রী নিহত হয়েছেন। তাঁরা সবাই একই পরিবারের সদস্য। আর নওগাঁর সাপাহারে যাত্রীবাহী ভ্যানে বালুবোঝাই ট্রাক্টরের চাপায় দুজন মারা গেছেন। এই দুটি দুর্ঘটনা বিশেষ করে সড়ক খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্য জেলা থেকে রাতে রওনা করা দূরপাল্লার বাসগুলো সকালে রাজধানীতে প্রবেশের সময় বেপরোয়া গতিতে চলে। টানা কয়েক ঘণ্টা বাস চালানোর কারণে চালকের চোখেও ঘুম ঘুম ভাবথাকে। অটোরিকশা চালকের অদক্ষতাও একটি বিশেষ কারণ বলে অভিহিত করেছেন অনেকে। অন্যদিকে নওগাঁয় যাত্রীবাহী ভ্যানে বালুবোঝাই যে ট্রাক্টর আঘাত করেছে, ট্রাক্টর মুলত শুধু জমি চাষের কথা থাকলেও সেটি এখন পণ্য বোঝাই করে চলাচল করে। এটিও একটি কারন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের সংখ্যা খই ফোটার মতো বাড়ছেই এ বিষয়ে সরকারকে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল। বড় শহর এবং মফস্বল শহরে বাসসেবা আরও উন্নত করতে সরকারকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সরকার মেট্রোরেল, উড়ালসড়ক আর বড় বড় সেতু তৈরিতে ব্যস্ত। এভাবে গণপরিবহন উন্নত না করার কারণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে ছোট যানের ব্যবহার বেড়ে গিয়েছিল। এ জন্য এসব দেশ সড়ক দুর্ঘটনাপ্রবণ হিসেবে পরিচিত পায়।

সড়কে মৃত্যুর ঘটনায় করা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও মামলার হিসাব থেকে দুর্ঘটনার সংখ্যা ও প্রাণহানির তথ্য সংরক্ষণ করে পুলিশ। তাদের তথ্য অনুসারে, গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ৫ হাজার ৮৮ জনের। এর আগের বছরে অর্থাৎ ২০২০ সালে দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৩ হাজার ৯১৮ জন। এক বছরের ব্যবধানে মৃত্যু বেড়েছে ২৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ। পুলিশের হিসাবে, ২০১৮ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ২ হাজার ৬৩৫ জন। আর ২০১৯ সালে দুর্ঘটনায় ৪ হাজার ১৩৮ জনের মৃতু হয়।

অবশ্য পুলিশের হিসাবের সঙ্গে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠনগুলোর তথ্যে বেশ পার্থক্য রয়েছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৬ হাজার ২৮৪ জন। ২০২০ সালে মারা যান ৫ হাজার ৪৩১ জন।

গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় যাঁরা প্রাণ হারান, তাঁদের মধ্যে ৬৭ শতাংশই অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে সক্ষম (১৫-৬৪ বছর বয়সী)। আর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) হিসাবে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনা এবং এর প্রভাবে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা।

সাড়ে তিন বছর আগে ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই থেকে ৬ আগস্ট পর্যন্ত নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছিলেন। সরকারের নানা প্রতিশ্রুতির পর তাঁরা রাজপথ ছেড়ে যান। কিন্তু সড়কে বিশৃঙ্খলা বন্ধ হয়নি।