মিম্বারে বসে পদত্যাগের ঘোষণা, দুইদিন পর প্রত্যাহার!

মিম্বারে বসে পদত্যাগের ঘোষণা, দুইদিন পর প্রত্যাহার!

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি, প্রেসবাংলা২৪.কম: দুইদিন না যেতেই মসজিদের মিম্বার বসে প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়া থেকে সরে আসলেন হেফাজতে ইসলামের নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি মাওলানা আব্দুল আউয়াল। কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃবৃন্দদের সাথে বৈঠকের পর তিনি প্রত্যাহারের ঘোষণা থেকে পিছু হটলেন। এমনটাই জানালেন হেফাজতের কেন্দ্রীয় যুগ্ন-মহাসচিব মামুনুল হক।

বুধবার (৩১ মার্চ) নারায়ণগঞ্জ শহরের ডিআইটি এলাকায় রেলওয়ে কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে হেফাজতের চার সদস্যের এক প্রতিনিধি দলের বৈঠক শেষে বিকেলে গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে মাওলানা আবদুল আউয়ালের এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ন-মহাসচিব মামুনুল হক।

যুগ্ন-মহাসচিব জানান, হেফাজতের আমীর জুনায়েদ বাবুনগরীর নির্দেশে তারা মাওলানা আবদুল আউয়ালের সাথে সাক্ষাৎ করতে নারায়ণগঞ্জে এসেছেন। সম্প্রতি নেতা-কর্মীদের সাথে নায়েবে আমীর আব্দুল আউয়ালের ভুল বোঝাবুঝি ও মান অভিমান সৃষ্টি হয়েছিল। সবার অনুরোধে সবকিছু ভুলে গিয়ে আব্দুল আউয়াল তার পদত্যাগের ঘোষণা প্রত্যাহার করেছেন। পূর্বের পদে বহাল থেকেই তিনি হেফাজতের পরবর্তী কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত থাকবেন।

গত ২৮ মার্চ সারা দেশে হরতাল কর্মসূচীতে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে মহাসড়কে সহিংসতা সৃষ্টি, গাড়ি পোড়ানো ও সাংবাদিকদের উপর হামলা এবং মারধরের ব্যাপারে গণমাধ্যম কর্মীদের প্রশ্নের জবাবে অভিযোগ অস্বীকার করে হেফাজতের যুগ্ন-মহাসচিব মামুনুল হক বলেন, সকাল ছয়টা থেকে তাদের নেতা-কর্মীরা শান্তিপূর্ণভাবে মহাসড়কে অবস্থান নিয়েছিলো।

আইন শৃংখলা বাহিনী অগণতান্ত্রিকভাবে তাদের উৎখাত করতে চাইলে কোথাও কোথাও বিশৃংখলা সৃষ্টি হয়। তবে হেফাজতের কেউ গাড়িতে অগ্নিসংযোগ বা সাংবাদিকদের মারধর করেনি বলে দাবি করেন যুগ্ন-মহাসচিব মামুনুল হক। একই সাথে বন্দুক ও গায়ের জোরে কারো প্রতি ব্যবস্থা না নিতে আইন শৃংখলা বাহিনীকে অনুরোধ জানান তিনি।

হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের প্রতিনিধি দল মাওলানা আব্দুল আউয়ালের সাথে বৈঠক করতে দুপুর ২টা ৫৫ মিনিটে ডিআইটি মসজিদে এসে উপস্থিত হন। আসর নামাজের জামাত শেষে বিকেল সাড়ে পাঁচটায় গণমাধ্যম কর্মীদের ব্রিফিং করেন হেফাজতের যুগ্ন-মহাসচিব মামুমনুল হক। এসময় প্রতিনিধি দলে আরো উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মহানগর শাখার সভাপতি জুনায়েদ আল হাবীব, যুগ্ন-মহাসচিব ফজলুল করীম কাসেমী এবং যুগ্ন-মহাসচিব মুফতি নাসির উদ্দিন মনির। সাথে ছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর কমিটির নেতৃবৃন্দ।

এর আগে গত ২৮ মার্চ শবে বরাতের রাতে নারায়ণগঞ্জ শহরের ডিআইটি রেলওয়ে কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে বয়ানে নানা ক্ষোভের বিষয় তুলে ধরে হেফাজতের পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন মাওলানা আবদুল আউয়াল। এ সময় মাওলানা আব্দুল আউয়াল দলীয় নেতা-কর্মীরা তাঁর নির্দেশনা মানছেন না বলেও অভিযোগ তোলেন। পরদিন মঙ্গলবার দুপুরে ফেসবুকে “শায়েখ মাওলানা আবদুল আউয়াল সাহেব সমর্থক” মানের একটি পেইজে তার পদত্যাগ সংক্রান্ত এমন বক্তব্যের একটি ভিডিওচিত্র আপলোড দেয়া হয়।

৪ মিনিট ১৩ সেকেন্ডের এই ভিডিওতে আবদুল আউয়াল হেফাজতে ইসলাম দল থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেন। পরে তার বক্তব্যের এই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়। মাওলানা আবদুল আউয়াল গত প্রায় ত্রিশ বছর যাবত রেলওয়ে কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে খতিবের দায়িত্ব পালন করে আসছেন

হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রিয় যুগ্ন মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর সেক্রেটারি মাওলানা মামুনুল হক বলেছেন, হেফাজতে ইসলাম কখনো সহিসংতায় বিশ্বাস করে না। গত হরতালে হেফাজতের ইসলামের নেতাকর্মীরা শান্তিপূর্ন অবস্থান নিয়েছে কোথাও আগ বাড়িয়ে হামলা করে ভাংচুর করেনি। হেফাজত কখনই বিশৃঙ্খলা পছন্দ করেন না। সহিংসতাকে প্রশ্রয় দেয় না। বুধবার বিকেল ৫টার দিকে নারায়ণগঞ্জ ডিআইটি মসজিদের সামনে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি। হেফাজতে ইসলামের নারায়ণগঞ্জ আমীর মাওলানা আব্দুল আউয়াল পদ থেকে সরে দাড়ানোর ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে বিকেলে ৩টায় ডিআইটি মসজিদে আসেন হেফাজতে ইসলামের দুইজন কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব জুনায়েদ আল হাবিব ও মাওলানা মামুনুল হক।

এসময় তাদের সাথে ছিলেন কেন্দ্রীয় নেতা মনির হোসাইন কাশেমী, ফজলুল করিম প্রমুখ। হরতালে হেফাজত ছিল অহিংস। হেফাজত কোন ধরনের হামলা মারধর ভাঙচুর করেনি। এটা বহিরাগত কেউ করেছে। এটা সাবোটাজ হতে পারে। হেফাজতে ইসলাম সাংবাদিকদের মূল্যায়ন করে। সাংবাদিকদের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে।’ স্থানীয় সূত্র জানায়, কেন্দ্রিয় নেতাদের সাথে প্রায় ২ ঘণ্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠকে নারায়ণগঞ্জ জেলা হেফাজতে ইসলামের আমীর মাওলানা আবদুল আউয়ালের মান অভিমান ভাঙানো হয়েছে। আপাতত জেলা আমীরের পদ থেকে ইস্তফা নেওয়ার যে ঘোষণা ছিল সেটা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন আবদুল আউয়াল। এখন থেকে জেলা ও মহানগর নেতারা আগের মতই একত্রে কর্মসূচী পালন করা হবে জানিয়েছেন বিরোধ মিমাংসা করতে আসা কেন্দ্রীয় নেতারা।

বিকেল ৩টা হতে ৫টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নেতারা নারায়ণগঞ্জের হেফাজত নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে মহানগর ও জেলার নেতারা হরতালের দিনের পরিস্থিতি বর্ণনা করেন। শেষে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এ সময়ে কোন বিরোধ না ঘটিয়ে সকলকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহবান করেন।

শেষে মামুনুল হক সাংবাদিকদের বলেন, ‘মাওলানা আবদুল আউয়াল আগের মতই দায়িত্ব পালন করবে। সকল প্রকার মান অভিমান সব ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবেই কাজ করবেন।’ পুলিশের অফিযোগ হেফাজতের হরতালে মহাসড়কে সহিংসতা হয়েছে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, হেফাজত সংহিসতা করেনি। যেটা হয়েছে আমরা তার নিন্দা জানাই। তিনি অভিযোগ করেন, হরতালে হেফাজত কর্মীদের উৎখাত করার জন্য পুলিশ খড়গহস্ত করেছে।

সাংবাদিকদের উপর হামলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হেফাজত সাংবাদিকদের উপর হামলা করেনি। সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় আমরা বিশ্বাস করি। সংবাদিকদের সাথে সুসম্পর্ক রেখে আমরা কাজ করিছি।

২৯ মার্চ সোমবার বিকেলে দেওভোগ মসজিদে হেফাজতে ইসলাম নারায়ণগঞ্জ মহানগরের উদ্যোগে আয়োজিত সারা দেশে মোদি বিরোধী বিক্ষোভে আহতদের সুস্থতা কামনা ও নিহতদের স্মরণে দোয়া মাহফিলের কার্যক্রম শেষে নেতাকর্মীদের নিয়ে আলোচনায় মাওলানা ফেরদাউসুর বলেন, ‘আমরা কেন্দ্রে অভিযোগ করব এবং ঢাকা মহানগরে অভিযোগ দিয়েছি যে এই সভাপতি আমাদের চলবে না। ওনার অতিতের ইতিহাস এরকম। উনি যখন হার্ডলাইনে দেখে তখন ব্যাকফুটে চলে যায়। নারায়ণগঞ্জ জেলার আমীর আল্লামা আব্দুল আওয়াল সাহেব সকাল ১০টায় যে ঘোষণা দিয়েছিলেন এই ঘোষণার সাথে আমরা একমত ছিলাম না।’ পরে সোমবার রাতে শবে বরাত উপলক্ষ্যে ডিআইটি সমজিদে আলোচনায় হরতালের দিন সকাল ১০টায় কেন সেই ঘোষণা দিয়েছিলেন সেই বিষয়ে জানিয়ে হেফাজতের পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা হেফাজতে ইসলামের আমীর মাওলানা আবদুল আউয়াল।

0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
কপিরাইট © ২০২০ | প্রেসবাংলাটুয়েন্টিফোরডটকম
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x