করোনায় নিহত প্রথম নারী: ভয়ঙ্কর স্মৃতির ছাপ পুতুলের বাড়িতে

করোনায় নিহত প্রথম নারী: ভয়ঙ্কর স্মৃতির ছাপ পুতুলের বাড়িতে

রুদ্রপ্রকাশ, প্রেসবাংলা২৪ডটকম: মূল সড়ক থেকে গলির কাছাকাছি এসে এক যুবককে জিজ্ঞেস করতেই সে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো-‘এই পথ ধরে ঠিক নদীর কাছাকাছি গেলেই পাভেলদের বাড়ি। শুধু ওই যুবক নয়, এলাকার সব মানুষের কাছে ওই বাড়িটি এখন পরিচিত। সবার মুখে মুখে।

কিছুদূর আসতেই একজন নারী জানতে চাইলেন-‘কাদের বাসায় যাবেন।

পুতুল বেগমের বাড়িতে যাব-এ কথা শোনার পর তিনিও কিছুদূর পথ সাথে এলেন। অনেকটা উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে ছিলেন। পেছন পেছন এগিয়ে এসে আঙ্গুল দিয়ে তিনি দেখিয়ে দিলেন-এই সেই পুতুল বেগমের বাড়ি।

বাড়িটি নিয়ে এখনও মানুষের আগ্রহের কমতি নেই। বাংলাদেশে করোনায় প্রথম নিহত নারী-পুতুল বেগম। ৩০ মার্চ নারায়ণগঞ্জের বন্দর রসুলবাগ এলাকার ওই নারী মারা যান। সরকারী হিসেবে তিনিই মারা যাওয়া প্রথম করোনা রোগী। এরপর ওই এলাকা লকডাউন। তাদের পরিবার লকডাউন। বন্দর লকডাউন। নারায়ণগঞ্জ লকডাউন। অনেক সময় পেরিয়েছে।

পুতুল বেগমের মৃত্যুর ঠিক ৮২দিন পরেও কেমন আছে তারা?

এ প্রশ্নের সন্ধ্যান করতে খোলা কাগজের এ প্রতিবেদক তাদের বাড়িতে হাজির হন।

সরেজমিন বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়-তিনতলা একটি নতুন ভবন একদম ফাঁকা। এখানে সেখানে আসবাবপত্র ও কাপড়-চোপর পড়ে রয়েছে। নির্মানাধীন ভবনটি অনেকটাই ভুতুরে।

বাড়িতে লোকজন এসেছে শুনে পাশের একচালা টিনশেড ভবন থেকে বেরিয়ে এলেন পুতুল বেগমের পুত্রবধু সেতু। সংবাদকর্মী পরিচয় দেয়ার পরে তিনি মুখটা বিষণ্ণ করে বলেন-বাসায় কেউ নেই। কেন এসেছেন আপনারা?

পরে তিনি তার স্বামী পাভেলকে ফোনে বিষয়টি অবহিত করেন। পাভেলের সাথেও কথা হয়। তিনি বিরক্তি নিয়ে বলেন-এসব নিয়ে আর কী লিখবেন!

গণমাধ্যমকর্মীদের দেখলেই অনেকটা বিরক্ত হন তারা। তাদের দাবি, পুতুল বেগম করোনায় মারা যাননি। মারা গেছেন চিকিৎসার অবহেলায়। হাসপাতালে ডাক্তারদের সাথে উচ্চবাচ্য করায় তাদেরকেও হোমকোয়ারাইন্টানে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু পুতুল বেগমের দুই ছেলে পাভেল ও নোবেল কেউ করোনা পজিটিভ ছিলেন না। এমনকি পুত্রবধু সেতুও।

অনেকটা দুঃসময় পার করেছেন তারা। করোনায় মা মারা যাবার পরে এলাকায় তাদের পরিবার নিয়ে নানা কথাবার্তা। সমাজের লোকজনের ভিন্নদৃষ্টি। পরিচিত ও পাশের মানুষগুলোর বদলে যাওয়া-সবমিলিয়ে শ্বাসরুদ্ধকর দুইমাস পার করেছেন তারা। তবুও আত্মীয়-স্বজন পাশে থেকে সাহস জুগিয়েছেন।

আশপাশের লোকজনদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, পুতুল বেগম মারা যাবার পরে অনেকটা একঘরে হয়ে যান তারা। সমাজের অনেকেই তাদের এড়িয়ে চলতে শুরু করে। আস্তে আস্তে সময়ের সাথে সাথে পরিস্থিতিও বদলাতে শুরু করে। এখন অনেকটাই স্বাভাবিক পুতুলের পরিবার। এলাকায় স্বাভাবিক চলাফেরা করছেন। মিশছেন সবার সাথে। কিন্তু এরমধ্যে পরিবারটির উপর দিয়ে বয়ে গিয়েছে অনেক ঝড়। পুড়িয়েছেন অনেক কাঠখড়।

 

বাংলাদেশে প্রথম গত ৮ মার্চ নারায়ণগঞ্জের টানবাজার এলাকায় একদিনেই তিনজন করোনা রোগীর সন্ধ্যান পাওয়া যায়। এরপর গত মার্চ প্রথম মারা যান পুতুল বেগম। গতকাল বুধবার পর্যন্ত এ জেলায় ৪ হাজার ৭৬৭জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এ পর্যন্ত ১০৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন।