বিগত বছরগুলোতে সর্বোচ্চ দাম ডিমের!

বিগত বছরগুলোতে সর্বোচ্চ দাম ডিমের!

ষ্টাফ রিপোর্টার, প্রেসবাংলা২৪.কম:  অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে যখন বাজারে অস্থিরতা চলছে ঠিক তখনই অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে ডিমের দাম। এক সময়ের পোলট্রি নগরী হিসেবে খ্যাত গাজীপুর জেলার প্রধান বাজারগুলোতে প্রতি হালি ডিম খুচরায় বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকা টাকা দরে। তারই প্রেক্ষিতে নারায়ণগঞ্জের বাজারগুলোতে প্রতি হালি ডিম বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায়, যা বিগত বছরগুলোতে সর্বোচ্চ দাম। এছাড়া সাড়াদেশের খুচরা বাজারেও একই দামে বিক্রি করছে বিক্রেতারা।

গাজীপুর জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের দেওয়া তথ্যমতে, জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ৬ হাজার ৬৭১টি পোলট্রি খামার রয়েছে। যেগুলোর মধ্যে লেয়ার মুরগির খামার রয়েছে ৪ হাজার ১০৬টি ও ব্রয়লার মুরগির খামার রয়েছে ২ হাজার ৫৬৫টি। ডিম উৎপাদনের জন্য লেয়ার খামারে দেশি বার্ডসহ মুরগির সংখ্যা ১ কোটি ৫০ লাখ। যেগুলো থেকে বছরে ১১৪ কোটি পিচ ডিম পাওয়া যায়। জেলায় প্রতিদিন গড়ে ডিম উৎপাদন হচ্ছে ৩১ লাখ ৬ হাজার ৬৬৬ পিস। জেলায় চাহিদা রয়েছে বছরে ৯১ কোটি।

জানা যায়, দিনের পর দিন ওষুধ ও খাদ্যের দাম বৃদ্ধি, শিল্পায়নের প্রসার এবং ঋণের চাপে গাজীপুরের সদর উপজেলা, টঙ্গী, জয়দেবপুর, কালিয়াকৈর, কাপাসিয়া ও শ্রীপুর উপজেলার অধিকাংশ পোলট্রি খামারি তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন।

গত ১০ বছর আগেও জেলার শ্রীপুর উপজেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে পোলট্রি ছিল ৩ হাজার ৫শটি। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র সাড়ে ৫৫০টিতে। এমন পরিসংখ্যান জেলার অন্যান্য উপজেলায়ও।

জেলার কালীগঞ্জ উপজেলায় বর্তমানে পোলট্রি খামারের সংখ্যা ৫৫২টি। যেখানে লেয়ার পোলট্রি রয়েছে ২৩২টি ও ব্রয়লার ৩৩০টি। উপজেলায় প্রতিদিন সাড়ে ৩ লাখ ডিম উৎপাদন ও বছরে ১২ কোটি পিচ ডিম উৎপাদন হয়।

কাপাসিয়া উপজেলায় ছোটবড় মিলিয়ে ১ হাজার ১০৩টি ফার্ম রয়েছে। যাদের মধ্যে লেয়ার ফার্মের সংখ্যা ৬৩০ এবং ব্রয়লার ফার্ম রয়েছে ৪৭৩টি। সেখানে লেয়ার মুরগি রয়েছে ৩৮ লাখ ৫০ হাজার; যা থেকে প্রতিদিন ডিম পাওয়া যাচ্ছে ২৮ লাখ ৮৭ হাজার ৫০০ পিস।

কালিয়াকৈর উপজেলায় মোট ৭৬১টি পোলট্রি ফার্ম রয়েছে। সেখানে লেয়ার ফার্মের সংখ্যা ৩১২টি ব্রয়লার ফার্ম রয়েছে ৩৯১টি। সেখানে লেয়ারের মুরগি রয়েছে ৩ লাখ ৫৮ হাজার ১০টি। প্রতি বছরে এ উপজেলায় ১৮ কোটি ডিম উৎপাদন হয়।

শ্রীপুর উপজেলায় সাড়ে ৫শ পোলট্রি ফার্ম রয়েছে। যেখানে লেয়ার পোলট্রি ১ হাজার ১৫০টি ও ব্রয়লার ফার্ম ৮২৪টি। সেখানে লেয়ার মুরগি রয়েছে ২২ লাখ ৫ হাজার। যা থেকে প্রতিদিন ৮ লাখ পিস ডিম উৎপাদন হচ্ছে।

জেলার কয়েকটি উপজেলার বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দুই সপ্তাহ আগেও ডিমের দাম হালি ছিল ৩০-৩৫ টাকা তা এখন বিক্রি হচ্ছে ৫৫-৬০ টাকায়। প্রতি ডজন ডিমে দাম বেড়েছে ৪০-৪৫ টাকা। মুরগির ডিমের পাশাপাশি বেড়েছে হাঁসের ডিমের দামও।

ডিমের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে বিক্রেতারা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহণ খরচ বৃদ্ধি এবং অনেক খামার বন্ধ হয়ে মুরগি ও ডিমের উৎপাদন কমে গেছে। তাই প্রতিদিনের ক্রেতা চাহিদার চেয়ে ডিমের সরবরাহ কম হওয়ায় দাম বাড়ছে। ভবিষ্যতে ডিম ও মুরগির দাম আরও বাড়বে বলেও আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। তবে দাম বাড়ার পরও বিক্রি তেমন কমেনি, বরং বেড়েছে।

এনজিওর ঋণের টাকায় ক্ষুদ্রভাবে লেয়ার খামার করেছেন কালিয়াকৈর উপজেলার মা পোলট্রি অ্যান্ড ডেইরি ফার্মের মালিক রিপন মিয়া। তিনি বলেন, প্রতি কেজি খাবার প্রায় দ্বিগুণ টাকায় কিনতে হচ্ছে আমাদের। বেশি দামে ডিম বিক্রি করেও ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছি না।

বক্তব্য দেওয়ার সময় উত্তেজিত হয়ে কাপাসিয়া উপজেলার সিংহস্রী এলাকার পোলট্রি মালিক রায়হান বলেন, ডিমের দাম সামান্য বেড়েছে তাই মিডিয়াগুলো নিউজ করে কিন্তু খাবারের দাম নিয়ে কেউ কিছু বলে না।

কালীগঞ্জ উপজেলার সোম বাজারে ডিম কিনতে আসা খলিল মিয়া বলেন, ঘরে মাংস-তরকারি না থাকলেও একটা ডিম ভাজি করে ভাত খাওয়া যেত। অন্য পণ্যের মতো সেটাও দাম বাড়ছে। গত এক সপ্তাহ আগে ৪০ টাকা হালি ডিম কিনেছি। আজকে প্রতি হালি ৬০ টাকা চাচ্ছে ওই দোকানি।

কালিয়াকৈর পৌরসভার কালামপুর গ্রামের মুদি দোকানি আব্দুস ছালাম বলেন, আমরা প্রতি ডিমে ৫০ পয়সা লাভ করি। সেখানে দোকান খরচ বাদ দিলে ২৫ পয়সা টিকে। বেশি দামে কিনে তো আর কম দামে বিক্রি করব না।

প্রতি হালি ৬০ টাকা দরে খুচরা বাজারে ডিম বিক্রি করেছিলেন জেলার জৈনা এলাকার মুদি দোকানি হেলাল উদ্দিন। তিনি বলেন, ডিমের ভ্যান থেকে ৫৬ টাকা হালি দরে তিনি কিনেছেন।

খাবার হোটেলে ৩০ টাকা পিস ডিম বিক্রি করেছিলেন সদর উপজেলার ভবানীপুরের রমিজ মিয়া। তিনি বলেন, বেশি দামে কিনতে হয় বিধায় তারাও বেশি দামে বিক্রি করছেন। এমন দাম নিয়ে কাস্টমারদের সঙ্গে ঝামেলা হচ্ছে।

বাংলাদেশ পোলট্রি রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য সচিব খ ম মহসিন  জানান, খাবারের মূল্য বৃদ্ধিতে পোলট্রি খামারিদের দিশেহারা অবস্থা। এখন তারা ব্যাংক ও এনজিওর ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছে। পোলট্রি খাদ্যের দাম স্বাভাবিক হলে ডিম ও মুরগির মাংসের দামও কমে যাবে।

গাজীপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এসএম উকিল উদ্দিন  জানান, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে দেশে ভুট্টা আমদানি কমে দাম প্রায় দ্বিগুণ হওয়া ও সয়াবিনের (সয়াবিনের খইল) দাম বেড়ে গেছে। এতে ডিমের দাম বেশি হচ্ছে। তারপরও এখানের উৎপাদিত ডিম জেলার চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি সারা দেশে বিক্রি হচ্ছে। বৈশ্বিক সংকট কাটলে ডিমের দাম কমে আসবে।