
সিদ্ধিরগঞ্জ প্রতিনিধি, প্রেসবাংলা২৪.কম: বাবা ছিলেন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট (ইপিআর) এর সৈনিক। ১৯৭১ সালে পরিবার ও জীবনের মায়া ত্যাগ করে যিনি পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়েছিলেন সম্মুখ সমরে। এই মুক্তিযোদ্ধা পিতা তার ২ ছেলেকে ইসলামী শিক্ষায় জ্ঞান দিয়ে তৈরি করেছিলেন মসজিদের ইমাম হিসেবে। এই মুক্তিযোদ্ধা পিতার এক সন্তানকে দেয়া হয়েছে বলাৎকারের অভিযোগ।
ঘটনাটি মিথ্যা উল্লেখ করে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে এলাকাবাসী। তারা বলছেন, ঘটনা সত্য হয়ে থাকলে অবশ্যই মসজিদ কমিটি ঐ ইমামের বিরুদ্ধে মামলা করতো বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দিতো। কিন্তু তা না করে মসজিদ কমিটি রহজ্যনক আচরণ করেছেন। এ মসজিদ কমিটির বিরুদ্ধে উক্ত ইমাম মসজিদের অর্থ আত্মসাতের অনেক প্রমাণ মুসল্লিদের কাছে তুলে ধরেছেন বিগত কয়েক বছর যাবত। এতে মসজিদ কমিটি ইমামের প্রতি দীর্ঘদিন অসন্তুষ্ট ছিলো। বারংবার তাকে মসজিদ থেকে বের করে দিতে চাইলেও মুসল্লিদের কারণে সম্ভব হয়নি মসজিদ কমিটির। উপরন্তু বলৎকারের মিথ্যে অভিযোগ তুলে কর্মস্থান (মসজিদ) থেকে রাতের অন্ধকারে হুমকি দিয়ে তাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মেয়াদ উত্তীর্ণ মসজিদ কমিটির নেতাদের বিরুদ্ধে।
এ ঘটনার পর থেকে এলাকায় সাধারন জনগনের মনে নানা রকমের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এলাকাবাসী এ ঘটনায় প্রশাসনের নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। ন্যাক্কারজনক এ ঘটনাটি ঘটেছে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন মিজমিজি পূর্বপাড়া (পাগলাবাড়ি) এলাকার বাইতুত তাকওয়া জামে মসজিদে।
মসজিদ কমিটির লোকজন জানায়, গত বৃহস্পতিবার (২৮ জানুয়ারি) বেলা ১১ টার দিকে পাগলাবাড়ি মসজিদ সংলগ্ন বসবাসরত এক স্কুল ছাত্র তার হারিয়ে যাওয়া মুরগীর খোঁজে আসে।তখন মসজিদের ইমাম সাহেবের সাথে ওই স্কুল ছাত্রের দেখা হয় এবং এরপর ওই ছাত্র বাড়িতে গিয়ে কান্নাকাটি করে তার পরিবারকে ইমাম সাহেবের অস্বাভাবিক আচরনের কথা বলে। আর তার সূত্র ধরে মেয়াদ উত্তীর্ণ এই মসজিদ কমিটি ইমাম সাহেবকে বলাৎকার করার চেষ্টাকারী হিসেবে অপবাদ দিয়ে মাগরিবের নামাজের পরপরই তাকে মসজিদ থেকে বের করে দেয়া হয়।
তবে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে ঐ ছাত্রকে ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর রাস্তায় স্বাভাবিক অবস্থায় চলাফেরা করতে দেখে স্থানীয় লোকজন।
এ ব্যাপারে ওই স্কুল ছাত্রের মা জানান, আমার ছেলে ছোট। আমাদের মানসম্মানের জন্য আমরা এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে চাচ্ছি না। আমরা কোন মামলা দায়ের করবো না।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিগত ১৫ বছর ধরে এই মসজিদে ইমামতি করে আসছিলেন এই ইমাম। ২০১৬ সাল থেকে মসজিদের নির্মাণ কাজ চলছে। সেই নির্মাণ কাজের যাবতীয় হিসাব নিকাশ রাখছিলেন ঐ ইমাম। ইমামের হিসাবনিকাশ রাখা মেয়াদ উত্তীর্ণ এই মসজিদ কমিটির কয়েকজন সদস্যের পছন্দ হয়নি। আর সেই থেকেই মসজিদের ইমামকে কিভাবে বিদায় করবেন তা ভাবছিলেন তারা। তবে মুসল্লি ও এলাকাবাসীর জন্য ইমামকে বাদ দিতে পারছিলেন না তারা। কারণ এলাকার মানুষ ও মসজিদের মুসল্লিরা ইমামকে বিশ্বাস করেন।
এলাকাবাসীর আশঙ্কাছিলো ইমামকে বিতাড়িত করলে মসজিদের কাজ বন্ধ হবে এবং সব টাকা আত্মসাৎ করবে মেয়াদ উত্তীর্ণ এই কমিটি। প্রায় একযুগ আগে এই মসজিদ কমিটি তৈরি হলেও তা আর নতুন করে গঠন করা হয়নি। এ কমিটিতে আওয়ামী লীগ ও জামায়েতে ইসলামীর দুই নেতার প্রভাব বেশি রয়েছে। মসজিদের মুতাওয়াল্লি হিসেবে রয়েছেন স্থানীয় জামায়েতে ইসলামীর নেতা আব্দুস সামাদ। যার ছেলে আবু সুফিয়ানের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে। মসজিদের জয়েন্ট সেক্রেটারি জামায়েতে ইসলামীর নেতা মোঃ কফিল আহমেদ। একযুগ ধরে চলা এই মসজিদ কমিটির বিরুদ্ধে মসজিদের টাকা আত্মসাৎ করে সন্তানকে বিদেশে পাঠানোসহ রয়েছে নানা অভিযোগ। মেয়াদ উত্তীর্ণ এই কমিটির সভাপতি কয়েকবার জনসম্মুখে পদত্যাগ করে নতুন কমিটি তৈরির কথা বললেও রহস্যজনক কারণে বিগত এক যুগে তা আর হয়নি।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, বিগত কয়েক বছর যাবত পরোক্ষভাবে মসজিদের সকল কিছু নিয়ন্ত্রণ করে বিএনপির কর্মী ও সিদ্ধিরগঞ্জ পুলের চাল ব্যবসায়ী মোঃ সালাউদ্দিন ওরফে মওদুদী সালাউদ্দিন। তিনি যা বলেন মসজিদে তাই হয় বলেও অভিযোগ এলাকাবাসীর। ইমামকে অপবাদ দিয়ে বের করে দেয়ার মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। এছাড়াও ছিলেন মেয়াদ উত্তীর্ণ এই মসজিদ কমিটির সভাপতি ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল আজীজ মাদবর, মসজিদের সহকারী সেক্রেটারি ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানা জামায়েতে ইসলামীর আমীর মোঃ কফিল আহমেদ, মসজিদের মুতয়াল্লি মিজমিজি পূর্বপাড়া এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী আবু সুফিয়ানের বাবা ও স্থানীয় জামায়েতে ইসলামীর নেতা আব্দুস সামাদ, কমিটির সেক্রেটারি চালের ব্যবসায়ী মওদুদী সালাউদ্দিনের ছোট ভাই জামাল উদ্দিন বাবুল। কমিটির ক্যাশিয়ার আব্দুল বাতেন, মসজিদ কমিটির সভাপতির ভাতিজা মিজমিজি পূর্বপাড়া এলাকার আফসার উদ্দীন আফসু, মোঃ শাহ-আলম, মোঃ মোশারফ হোসেন ওরফে বিদ্যুৎ মোশারফ ও মোজাম্মেলসহ আরো কয়েকজন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মসজিদের স্থানীয় কয়েকজন মুসল্লী বলেন, আমরা ইমাম সাহেবকে ১৫ বছর ধরে দেখছি, তার পিছনে নামাজ পড়েছি, চলাফেরা করেছি কখনো তো তার মধ্যে এমন আচরণ দেখি নাই। মসজিদের কাজ চলছে কয়েকবছর যাবৎ সেই কাজের হিসাবনিকাশ সব ইমাম সাহেব দেখেন। যার কারনে কিছু লোকের স্বার্থে আঘাত লাগে, তাই হয়তো একজন ইমাম সাহেবকে এভাবে মারাত্মক একটি অভিযোগ এনে তাকে বিতাড়িত করা হলো। আর যদি ইমাম সাহেবের উপর আনা অভিযোগ সত্যি হয় তাহলে তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিলো। মামলা করা দরকার ছিলো। মামলা না করে প্রশাসনের স্মরণাপন্ন না হয়ে এভাবে রাতের অন্ধকারে তাকে বিতাড়িত করা উচিত হয়নি। আমরা এলাকাবাসী এই মেয়াদ উত্তীর্ণ কমিটির উপর বিরক্ত। তারা কথায় কথায় বলেন এটা নাকি তাদের পারিবারিক মসজিদ। এখানে যা হবে তাদের ইচ্ছে মতন হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে একযুগ ধরে মসজিদ কমিটির সহকারি সেক্রেটারি ও জামায়েতে ইসলামীর নেতা মোঃ কফিল আহমেদ বলেন, তিনি (ইমাম সাহেব) শরীয়াহ্ বিরুধী কাজ করেছে বিধায় তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ছেলের বয়স কম তাই আমরা আইনি কোনো ব্যবস্থা নেইনি। গনমাধ্যমে আসলে সমস্যা আছে। মেয়াদ উত্তীর্ণ কমিটির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, প্রায় তের- চৌদ্দ বছর পূর্বে ১১ সদস্য বিশিষ্ট এই কমিটি গঠন করা হয়েছিলো। যাদের মধ্যে বর্তমানে দুজন মৃত ও একজন নিজ ইচ্ছায় পদত্যাগ করেছে। যখন মসজিদ কমিটি গঠন করা হয় তখন এই কমিটির কোনো মেয়াদ দেয়া ছিলো না।
এ বিষয়ে জানতে মেয়াদ উত্তীর্ণ ওই মসজিদ কমিটির সভাপতি আব্দুল আজিজ মাদবরের সাথে মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইমামদের চাকরি কোনো বান্ধা (স্থায়ী) চাকরি না। তাকে আগে থেকেই সময় দেয়া হয়েছিলো। রাতের আধারে মুসল্লিদের না জানিয়ে হঠাৎ করে ইমামের চাকরি চলে যাওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যেই মুসল্লি জানতে চায় তাকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিয়েন। সবাইকে সব কিছু জানাতে হবে এমন কোনো কথা নেই।
কমিটির মেয়াদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মসজিদের মুতয়াল্লিকে বলে কমিটি ভেঙ্গে দিয়েছি। মসজিদ আপাতত এডহক (আহবায়ক) কমিটি দিয়ে চলছে।