স্মৃতিতে বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধ : মুঃ জালাল উদ্দিন নলুয়া

0
20
fb-share-icon20

মুঃ জালাল উদ্দিন নলুয়া
সদস্য বাংলা একাডেমি

 

সময়টা ১৯৬৫ইং সাল। তখন আমি নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুলের দশম শ্রেণীর বিজ্ঞান বিভাগের ‘ক’ শাখার ছাত্র। আমার সংরক্ষণে ছয় নম্বর খাতায় পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ২৪.৭.১৯৬৫ইং তারিখের ৭ নম্বর বই এর ৬৪৮ নং সদস্যভূক্তির রশিদ সংরক্ষিত রয়েছে। তখন চাঁদার হার ছিল ১২ পয়সা। জীবনকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবার স্বপ যখন বুনছি ঠিক ২৭.১১.১৯৬৫ইং তারিখে এসএসসি নির্বাচনী পরীক্ষার চারদিন পূর্বে বাবা চলে যান। আমার রাজনীতি করা হলোনা। স্মৃতি হয়ে রইল ১২ (বার) পয়সার রশিদ। তবে রশিদে থাকা ‘আমি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের আদর্শ,উদ্দেশ্য ও কর্মসূচীর প্রতি পূর্ণ আস্থা জ্ঞাপন এবং প্রতিষ্ঠানের নিয়ম শৃংখলা রক্ষার অঙ্গিকার করিয়া সদস্যভূক্ত হলাম।’ এই অঙ্গীকার থেকে প্রত্যক্ষ রাজনীতির সাথে যুক্ত না হতে পারলেও ভোটার হবার পর থেকেই ‘নৌকা’ প্রতীকে ভোট দিয়েছি। এর ব্যত্যয় ঘটেনি।

 

বাবা চলে যাবার পর পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে চলে আসে। লেখাপড়া,পরিবারের দায়িত্ব গ্রহণ করতে গিয়ে পাল্টে যায় ছকে বাঁধা স্বপ্নের মানচিত্র। দুটি অবিবাহিত বোন। তাদেরকে সৎপাত্রে পাত্রস্থ করা এবং মায়ের খেদমত করাই তখন জীবনের মুখ্য উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায়। শিক্ষকতায় প্রবেশ করি,পাশাপাশি লেখাপড়া চালিয়ে যাই। প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতির সাথে গাটছড়া বাঁধা হয়নি। কিন্তু রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের স্বাক্ষী হতে থাকি। তখন একজন মানুষের কন্ঠ আকাশে বাতাসে ধ্বণিত হতো। যিনি বঙ্গবন্ধু।

 

এরমধ্যে এম.এ উত্তীর্ন হই জগন্নাথ কলেজ (বর্তমান জগন্নাথ বিশ্বিবিদ্যালয়) থেকে। লেখাপড়া ও চাকরীর ফাঁেক ফাকেঁ নাটক লিখতে থাকি। আকস্মিক পিতৃবিয়োগ জনিত পুঞ্জিভূত ব্যথার অশ্রু দিয়ে লেখা হলো ‘অভাগা’। পরবর্তীতে লিখি ‘অশ্রু’। দুটি নাটক ১৯৬৭ ইং থেকে যথাক্রমে (৩+৪ ) = ৭ বার মঞ্চস্থ হয়। মনে পড়ে, তখন ১৯৬৪ সাল,শীতলক্ষ্যা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ আয়োজিত একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল কুমুদিনি মাঠে (বর্তমানে রনদা প্রসাদ বিশ্বিবিদ্যালয়)।

 

স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা জনাব তসদ্দক হোসেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য,নারায়ণগঞ্জ মহকুমা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ভাষা আন্দোলনের অন্যতম নেতা মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একান্ত সহচর ছিলেন। তাঁর ভাজতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মী আহাম্মদ হোসেন কয়েকবার সভায় যাবার বিষয়ে বাবাকে তাগিদ দিয়েছিলেন। বাবার অসুস্থতা সত্বেও বাবা মত দিয়েছিলেন সভাটিতে যাবেন। তবে স্মৃতির পাতায় সঠিক দিন তারিখটি মনে পড়ছেনা। তখন আমি নবম শ্রেণীর ছাত্র। সেদিন অনুষ্ঠানস্থলে বাবার সাথে আমি গিয়েছিলাম । অনুষ্ঠানস্থল কুমুদিনি মাঠে গিয়ে দেখি সারি সারি চেয়ার বিছানো। আশেপাশের এলাকা থেকে লোকজন এসে অনুষ্ঠানস্থল পূর্ণ হয়ে গেল। বাবা এবং আমি চেয়ারে বসলাম। সভার শুরুতে বেশ কয়েকজন নেতা বক্তব্য রাখলেন। অবশেষে বক্তব্য রাখার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হলো নেতাকে। উঁচু মানানসই দেহের অধিকারী সাদা পাঞ্জাবী পায়জামা পরা চোখে চশমা। তিনি নেতা সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। নেতা মাইকের সামনে দাঁড়াতেই মুর্হুমুহু করতালি। করতালি থামতেই চায়না। নেতা ধীরে ধীরে সবাইকে থামতে বললেন। ধীরে ধীরে মাঠে নেমে এলেন পিন পতন নীরবতা। এতবছর পর এখনো ভাসে নেতার সেদিনের তেজোদীপ্ত উচ্চারণের বক্তব্য।

 

তিনি বললেন,‘ভায়েরা আমার আওয়ামী লীগ পুনর্গঠিত হতে যাচ্ছে। প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে ১৭ জন করে সদস্য নেয়া হবে। তবে ১৭জন পাঞ্জাবী আছকান এবং মাথায় জিন্নাহ টুপি পরিহিতকর্মী আমি চাইনা। আমি এমন ১৭জন নিবেদিত কর্মী চাই যারা এক ডাকেই চলে আসবে হাতে লাঠি নিয়ে, মালকোচা মেরে। তবে একটি কথা বলতে চাই যখন যেমন তখন তেমন এমন লোক আমি চাইনা। অমন লোকের আমার দলে দরকার নেই।’

 

নেতা স্বভাবসুলভভাবে একটি গল্প বললেন,গল্পের সারবস্তু এই যে, এক শ্রেণীর লোকদের সুবিধা গ্রহণের গল্প। যারা নিজের সুবিধা আদায় করার জন্য যেখানে যেমন দরকার তেমন ভূমিকা পালন করেন। নেতার গল্প বলা শেষ করার পর বললেন, আমি সুবিধাবাদীলোক চাইনা। আমার দলে এই শ্রেণীর লোকের ঠাঁই হবেনা। বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য শেষ হবার পর বাবা স্বগত উক্তি করলেন,‘বাঘের বাচ্চা’। সেদিনই আমি প্রথম বক্তব্য শুনেছিলাম নেতার। সেদিন থেকে ভক্ত হয়েছিলাম নেতার বক্তব্যের। এরপর যখনই শুনতাম বঙ্গবন্ধু নারায়ণগঞ্জ আসবেন। তখনই চলে যেতাম বক্তব্য শুনতে। বিশেষ করে বক্তব্যের সময় অপেক্ষা করতাম কখন তিনি গল্পের অবতারণা করবেন। তাঁর গল্পগুলো ছিল অবাংগালীদের শোষণ শাসনের বিরুদ্ধে। মনে পড়ে কোন একটি সভায় তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেছিলেন,‘আগে খান পিছে খান, কোথা থেকে উড়ে এলো খান আব্দুল কাইয়ুম খান’। যখন নেতাকে দেখতাম পাইক টানতে। তখনই বাবার ৬৪ সনে বলা মুগ্ধ উক্তির কথা মনে পড়তো ‘বাঘের বাচ্চা’।

 

এখনো নারায়ণগঞ্জের পৌর পাঠাগার মিলনায়তন, রহমতউল্লাহ ইনষ্টিটিউটের স্থানগুলো দেখলে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি মনে পড়ে। এই স্থানগুলোতে তিনি আসতেন এবং বক্তব্য প্রদান করতেন। আশি দশকে ভাষা আন্দোলন ভিত্তিক নাটক ‘বাংলা আমার বাংলা’ লিখতে গিয়ে ৪৮এর সংগ্রামী ছাত্রনেতা বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি। দেখেছি তাঁর প্রতিবাদী ভূমিকা। ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ৫২ তে তিনি কারাগারে ছিলেন। স্বৈরাচারী নাজিমুদ্দিনের সাথে চুক্তির খসড়া নিয়ে সংগ্রামী ছাত্রদের পক্ষে তাকে চুক্তির বিষয়ে অবহিত করা হয় এবং তাঁর নির্দেশনা চাওয়া হয়। ১৯৪৮ এর সংগ্রামী ছাত্রনেতা ১৯৫২এর রক্তাক্ত পথ পেরিয়ে ৫৪-৬২-৬৬- ৬৯ইং সালের গণতন্ত্রের পতাকা বহন করে জনতার হৃদ মাজারে ঠাঁই নিলেন। বাঙ্গালির মর্মস্থল থেকে বেরিয়ে এলো,‘জেলের তালা ভাংব/ শেখ মুজিবকে আনব’। ০৭.১২.১৯৭০ইং নির্বাচনে সংগ্রামী দীক্ষায় দীক্ষিত বীর বাঙ্গালী তাকে ঐতিহাসিক বিজয় দান করেন। বিনিময়ে তিনি শোষণের নাগপাশ কেটে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংগালির হাতে তুলে দেন লাল সবুজের পতাকা। সেই অভূতপূর্ব বিজয়ে ‘জয় নৌকা’ শিরোনামে একটি নাটিকা লিখেছিলাম। নাটিকাটি নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের তৎকালীন কার্যালয়ে আওয়ামী লীগ নেতা তসদ্দক হোসেন সাহেবের উপস্থিতিতে বি.কে রোডস্থ কাঠের দোতলায় চিত্রাভিনেতা সালাহউদ্দিন আহম্মেদ সান্টু এবং অন্যান্যের পরিবেশনায় ১৯.১২.১৯৭০ইং তারিখে প্রচারিত হয়।

নাটিকাটি পরবর্তীতে কবি ও গীতিকার লুৎফা জালাল সম্পাদিত মুঃ জালাল উদ্দিন নলুয়ার নাট্যগুচ্ছ (২০১৮) গ্রন্থে প্রকাশিত হয়। ০৪.০৩.১৯৭১ইং তারিখে দক্ষিণ নারায়ণগঞ্জ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহবানে বক্তব্য প্রদান করি,‘অত্যাচারের ষ্টিম রোলার চলছে বাংলার বুকে। গত রাতের গুলী বর্ষনে অগণিত লোক বাংলা মায়ের কোলে ঢলে পড়েছে। আবু জর গিফারী কলেজের ছাত্র জন্মদাত্রী মায়ের কোলে ফিরে যায়নি। চির আশ্রয় নিয়েছে বাংলা মায়ের কোলে।ওগো জন্মভূমি ,জননী মা আমার, তোমার আরও কত রক্ত চাই। কেন তোমার রক্তের তৃষ্ণা মিটেনা। তুমি কেন এত অশান্ত,অতৃপ্ত। জন্মভূমি,জননী মা আমার ধানের দেশে আর গানের দেশে কেন শুধু অশ্রুই ঝরে। আমরা কি তোমার বুকে মাথা উঁচিয়ে চলতে পারবনা। শান্তি কি বাংলায় প্রতিষ্ঠিত হবেনা। নিশ্চই হবে। হতেই হবে।’

স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রথম শহীদ ছাত্রনেতা ফারুক ইকবালের পাক হানাদার বাহিনীর গুলীতে রাজপথে ৩ মার্চ,৭১ ই তারিখে শহীদ হবার পর ‘জয়বাংলা’ শিরোনামে ১৮.০৩.১৯৭১ইং তারিখে নাটিকাটি লিখি। পরবর্তীতে নাটিকাটি ‘স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা’ শিরোনামে মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও প্রাবন্ধিক ড. জেবউননেছা সম্পাদিত ‘মুঃ জালাল উদ্দিন নলুয়া রচিত ‘বাংলা আমার বাংলা (২০১৮)’ গ্রন্থে ৫৭-৬১ নং পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়।

 

৭১এর ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দিলেন। বজ্রকন্ঠে ঘোষণা দিলেন,ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোল। স্পষ্ট মনে পড়ে,১৯৬৪ইং সালেই আওয়ামী লীগের পুনর্গঠনকালে সারা বাংলাদেশে প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে তিনি ১৭ জন করে নিবেদিত কর্মী চেয়েছিলেন-যারা একডাকে লাঠি হাতে চলে আসবে। ০৭মার্চ,১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বেতারে প্রচার করার কথা থাকলে ও সামরিক কর্তৃপক্ষ হতে দেয়নি। পরদিন ১৯৭১ এর ৮ মার্চ,সকাল ৮.৩০মিনিটে পুনঃ প্রচার হয়। বেতারে বঙ্গবন্ধুর দলীয় বার্তা প্রচারের জন্য সকাল ৮.৫৫ মিনিট এবং দুপুর ১.৩০মিনিট স্পেশাল বুলেটিনের ব্যবস্থা করা হয়। তখন পূর্ব বাংলার প্রতিটি লোক এগিয়ে গিয়েছে গণতন্ত্রের পতাকাবাহী বঙ্গবন্ধুর আদেশে। ১৯৭১ এ নেতার ডাকে দেশে যখন মুক্তিযুদ্ধ চলছিলো। তখন শত ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও অংশগ্রহণ করতে পারিনি। কারণ ঘরে তখন বিবাহযোগ্যা বোন। তাদের নিরাপদে রাখা ও আমার জন্য একটি যুদ্ধ ছিল। ওদিকে বড় ভাই এর চাষাড়ার মাসদাইরের হেলাল ভাইয়ের বাড়ি এবং বড় বোন রহিমা আপার বাবুরাইলের বাড়ী হানাদার বাহিনী পুড়িয়ে দেয়। স্বাধীনতা যুদ্ধে হাতে অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারিনি। দুইজন অবিবাহিত বোনদের নিরাপত্তা প্রদানের অতন্দ্র প্রহরী হয়েছিলাম পুরোটা যুদ্ধ। এটিও একটি যুদ্ধ ছিল আমার। কিন্তু আমাদের পরিবার স্বাধীনতা যুদ্ধে তাদের বাড়ীঘর খুইয়েছেন।

 

আমার মাতৃকূলের মামাতো ভাই বিশিষ্ট কলামিষ্ট এবং ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ওয়াহিদুল হককে ১৯৭১ এ বাংলাদেশের শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের প্রতিনিধি প্রতিষ্ঠান’ বাংলাদেশ বুদ্ধিজীবী মুক্তিসংগ্রাম পরিষদের এই স্কোয়াড পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান করা হয়। এই স্কোয়াড ‘বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রাম শিল্পী সংস্থা’ নামে অভিহিত এই গানের স্কোয়াড ‘বাংলাদেশ বুদ্ধিজীবী মুক্তিসংগ্রাম পরিষদ’ ও বাংলাদেশ সহায়ক শিল্পী সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী সমিতির যুগ্ম উদ্যোগে বাংলাদেশের মুক্তাঞ্চলে,শরণার্থী শিবিরে ,কলকাতায় এই রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ও দিল্লীতে ‘রুপান্তরের গান’ সহ অন্যান্য অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে জনমত সংগঠিত করে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন (তথ্যসূত্র: মামাতো ভাই মুক্তিযোদ্ধা এনামুল হকের কাছে সংরক্ষিত ৭ ডিসেম্বর,১৯৭১ইং তারিখে প্রেরিত বাংলাদেশ সহায়ক শিল্পী সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী সমিতির চিঠি থেকে) হয়। মামাতো ভাই এনামুল হক বাংলাদেশ মুক্তিসংগ্রাম শিল্পী সংস্থার হয়ে অনেক কাজ করেছেন। সারা ভারতবর্ষ চষে বেরিয়েছেন অর্থ সংগ্রহের জন্য। যে অর্থ তৎকালিন মুজিবনগর সরকারের কোষাগারে জমা হতো। মামাতো ভাই ইয়াকুব আলী ভূইয়া ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। আর এক মামাতো ভাই জিয়াউল হক মিরপুরের নেতৃস্থানীয় নেতা ছিলেন । ৭১এ তিনি এ শহীদ হন এবং ভাতিজা হাবিবুর রহমান ভূইয়া ও একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বঙ্গবন্ধু নেতৃত্বে দেশ পেলাম বাংলাদেশ। ২৫.১২.১৯৭১ ইং তারিখে সরকারী ও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা প্রচলনের সিদ্ধান্তে অভিনন্দন জানিয়ে ‘দৈনিক পূর্বদেশ’ পত্রিকায় চিঠি পাঠিয়েছিলাম।

 

নেতা বাংলাদেশে ফিরে আসেন ১৯৭২ এর ১০ জানুয়ারী। যে মাঠে ৯ মাস আগে বলেছিলেন,এবারের সংগ্রাম,মুক্তির সংগ্রাম’। ঠিক সেই মাঠে তিনি ৯ মাস পরে স্বাধীনতার আলোকে ভাষণ দিলেন,সংবর্ধিত হলেন। নেতা দূরদর্শী বটে। বাংলাকে তাঁর মতো এত ভালোবেসেছে কিনা তা আমার জানা নেই। বঙ্গবন্ধু ও
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত। একটি ব্যতীত আর একটি কল্পনা করা যায়না যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দীপ্ত হাতে বঙ্গবন্ধু যখন দেশ পরিচালনা করছিলেন তখন পরাজিত কুচক্রিমহল ১৯৭৫ সনের ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে। বঙ্গবন্ধু যে দেশকে নিয়ে স্বপ্ন রচনা করেছিলেন। বুনেছিলেন স্বপ্ন ,সে স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার জন্য অসীম সাহসিকতা,অফুরন্ত দেশপ্রেম,অপার ধৈর্য নিয়ে, পিতা হারানোর শোককে শক্তিতে পরিণত করে দিনান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন দেশরত্ন এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আমাদের সকলের সততা, ন্যায়পরায়নতা, জবাবদিহিতা এবং অকুন্ঠ দেশপ্রেমই পারে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ গড়তে।

 

মনে পড়ছে, বঙ্গবন্ধুর মহাপ্রয়ানে ১৯৭৫ সালের ১৬ আগষ্ট লিখি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ‘বজ্রকন্ঠ’ কবিতা। যে কবিতাটি বর্তমানে রাজধানী ঢাকার বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে সংরক্ষিত হয়েছে। ২২.০১.২০১৭ইং তারিখে কিউরেটর মোঃ নজরুল ইসলামখানের হাতে বাঁধাই করে কবিতাটি হস্তান্তর করি। কবিতাটির স্বকন্ঠে আবৃত্তির ভিডিও চিত্রটি জাদুঘরের দাপ্তরিক সামাজিক মাধ্যম পেজে সংরক্ষিত রয়েছে। মাছরাঙ্গা টেলিভিশনের ২২.০১.২০১৫ইং তারিখে ‘রাঙ্গা সকাল’ অনুষ্ঠানে কথা সাহিত্যিক হিসেবে সাক্ষাৎকার প্রদানের সময় ও এই কবিতাটিই আবৃত্তি করেছিলাম। পরবর্তীতে ২০১৮ইং সনে প্রকাশিত ড. জেবউননেছা সম্পাদিত ‘মুঃ জালাল উদ্দিন নলুয়া রচিত বঙ্গবন্ধু একুশ ও নির্বাচিত কবিতা’ গ্রন্থে ১৪ পৃষ্ঠায় কবিতাটি প্রকাশিত হয়। বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা জানিয়ে সংক্ষিপ্ত এই
স্মৃতিকথাটি শেষ করব উক্ত কবিতাটিই দিয়ে – ‘বজ্রপাতে যেমন নির্বাক হয়ে যায় সচল মানুষ । বিদ্যুৎ যেমন আচমকা ছিনিয়ে নেয় সরব কন্ঠ। জলোচ্ছাস যেমন অজান্তে ভাসিয়ে দেয় জনপদ। তেমনি তোমার স্বাপ্নিক-আকসি¥ক অন্তর্ধানে- আমরা হয়েছি ক্ষণিকের মূক-বধির-অন্ধ। থেমে গেছে জীবন ঘড়ি, পতন হয়েছে তালের।

 

বজ্রপাতের চেয়ে নির্মম, বিদ্যুৎতের চেয়ে ভয়ংকর, জলোচ্ছাসের চেয়ে মর্মান্তিক, তোমার বিদায় বার্তা। তোমার জন্য অশ্রু জমে হলো বরফের উঁচু পাহাড়। এ পাহাড়ে চিড় ধরবেই, অশ্রু গলবেই, ফেনায়িত হবে সতত-ক্ষোভ-কান্না-শোক। শোক পরিণত হবেই অমিত শক্তিতে। অশ্রু সাগরে তোমাকে আমরা খুঁজে নেবোই নেবো। হৃদয়ের গভীরে তোমার বাসা তুমি ‘বঙ্গবন্ধু”।

0
20
fb-share-icon20
0 0 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
কপিরাইট © ২০২০ | প্রেসবাংলাটুয়েন্টিফোরডটকম
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x